

মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র (পেশাজীবী ও সাংবাদিক)
আইন ও সাংবাদিকতা—এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ ও অপরিহার্য সমন্বয়। একজন মূলধারার সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালনে কখনোই আপোষহীন। আলো-আঁধারের দেয়াল ভেঙে সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়াই সাংবাদিকতার মূল দর্শন। ঘটনার ভেতরের বিষয় এবং বিষয়ের ভেতরের ঘটনা—এই দুইয়ের সমন্বয় করতে আইন জানা ও আইন মেনে চলা একজন সাংবাদিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের কাঠামোর মধ্যেই সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ পরিবেশন করেন। খবর বহু রকমের হতে পারে—রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবা, ব্যক্তি, অপরাধ, ধর্ম, অর্থনীতি কিংবা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি। ইংরেজিতে ‘NEWS’ শব্দটি যেমন উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম—চার দিকের তথ্যের সমন্বয়কে বোঝায়, তেমনি একজন সাংবাদিক চারদিকের বাস্তবতা তুলে ধরেন সমাজের সামনে।
একজন পেশাজীবী সাংবাদিক তথ্য অধিকার আইনের আলোকে দায়িত্বশীল ও বিধিবদ্ধভাবে সংবাদ প্রকাশ করেন। তবে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান অবশ্যই সম্পাদকীয় নীতির নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে অনুমোদিত ও পরিচালিত হতে হবে।
পেশাগত দায়িত্ব পালনে একজন সাংবাদিককে অনেক সময় জীবনঝুঁকি নিয়েই মাঠে নামতে হয়—গণমিছিলের ভিড়ে, সংঘাতের মাঝখানে, সংঘটিত অপরাধের সময় কিংবা যে কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও সাংবাদিক সত্য তুলে ধরেন। এটাই সাংবাদিকতার প্রকৃত রূপ। এর অর্থ এই নয় যে, কোনো সাংবাদিক কারো ব্যক্তিগত শত্রু বা এজেন্ট। মূলধারার সাংবাদিকতা মানেই জনগণের পক্ষে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।
গণমাধ্যম না থাকলে দেশের খবর মানুষ জানবে কীভাবে?
কোন জেলায় কী ঘটছে, কোথায় কী হচ্ছে, কে করছে, কেন করছে—এই সব প্রশ্নের উত্তর সমাজ পায় সাংবাদিকদের কলম ও ক্যামেরার মাধ্যমে। সংবাদপত্র প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা যদি পেশাগত দায়িত্ব থেকে কলম বিরতি নেন, তবে জনগণ তথ্য পাবে কোথা থেকে?
আইন মেনে সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিকদের কারো কাছে ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা নেই। তথ্যসূত্র ও ডকুমেন্টারি প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার নিয়ম। সাংবাদিকতাকে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বা রাজনৈতিক বিভ্রান্তির সঙ্গে মেলানো মানে সাংবাদিকের পেশাগত অধিকার হরণ করা।
একজন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী রাষ্ট্রের একজন সংগ্রামী নাগরিক। কারণ দেশের যে কোনো অরাজকতা, মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ বা সংকটে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তার প্রাণনাশের ঝুঁকি ও সম্মানহানির আশঙ্কা থাকে। এর মানে এই নয় যে, সাংবাদিকরা সম্মানহীন—বরং সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের কাছে সম্মানিত নাগরিক।
দেশ, রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে বিনীত আহ্বান—সাংবাদিকদের অধিকার বাস্তবায়নে ন্যায্য বেতন, ভাতা ও সম্মানী নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকরা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির অংশ।
সাংবাদিক জানেন—সত্য ও গঠনমূলক সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে সবার মন রক্ষা করা সম্ভব নয়। অপরাধীর কাছে সাংবাদিক কখনো আপোষ করে না, মাথা নতও করে না। অথচ কিছু অপশক্তি ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়, মামলা-হয়রানি ও নিপীড়নের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে দমিয়ে রাখতে চায়। এই প্রবণতার অবসান ঘটাতে হবে।
সাংবাদিক স্বাধীন এবং স্বাধীনভাবেই সংবাদ পরিবেশন করবে। কোনো রক্তচক্ষু সাংবাদিকের কলম কেড়ে নিতে পারবে না। বরং জনগণসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উচিত তথ্য দিয়ে সাংবাদিকদের সহায়তা করা, যাতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সমাজের সামনে আসতে পারে।
একজন সাংবাদিক মানেই একজন মেধাবী মানুষ। সাংবাদিকদের ধ্বংস করা যাবে না, হবেও না। বরং সমাজের অসংগতি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ দেখানোই সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
আপোষহীন সংবাদনীতির বাস্তবায়নে সাংবাদিক সমাজ আজ আরও ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
