কুমিল্লায় অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি পুলিশের, তিনজন গ্রেপ্তার

কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম (১৩) হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আরও একজনকে আটক করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, অপ্রতীমের নিখোঁজের ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পারে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার চারপাশে পাহাড়ঘেরা একটি নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।

পরবর্তীতে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা সাইফুল ইসলাম তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন অপ্রতীমকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য দেয় বলে জানানো হয়েছে।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন জানায়, অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাকে ওই নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও তার এক বন্ধু জড়িত থাকার কথাও তুহিন পুলিশকে জানায়।

তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ তার বন্ধু মো. কামরুল হাসানও ঘটনায় জড়িত থাকার কথা জানায় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। পরে ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকেও হেফাজতে নেওয়া হয়।

পুলিশ আরও জানায়, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও তার দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেল আনুমানিক ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতীম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করে। এতে অপ্রতীম গুরুতর আহত হয় এবং একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

এরপর তুহিন অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এ ঘটনায় সিয়াম (১৯) নামের আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসানকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, ঘটনার পেছনে আরও কোনো বিষয় রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রতিবেদন (চার্জশিট/CS) বিজ্ঞ আদালতে দাখিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয়

১. সাইফুল ইসলাম তুহিন(১৯)
পিতা—নুরে আলম
মাতা—শিরিনা আক্তার
ঠিকানা—সানন্দা (মৈশান বাড়ি), ২৪ নম্বর ওয়ার্ড, কুসিক, সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা।
পুলিশের তথ্যমতে, তিনি ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা ছেড়ে দেন।

২. মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫)
পিতা—মমিন হোসেন
মাতা—জুলি আক্তার
ঠিকানা—সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি), ২৪ নম্বর ওয়ার্ড, কুসিক, সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা।
পুলিশের তথ্যমতে, তিনি ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

৩. মো. কামরুল হাসান
পিতা—মো. আব্দুল কুদ্দুস
মাতা—কুলসুম আক্তার
ঠিকানা—হাতিগাড়া, কালিবাজার, কোতোয়ালি, কুমিল্লা।

৪. মো. সিয়াম (১৯)—আটক
পিতা—মো. সেলিম মিয়া
মাতা—শিরিনা আক্তার
ঠিকানা—এলাহীপুর, সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা।
পুলিশের তথ্যমতে, তিনি আফজাল খান ডিগ্রি কলেজ, দৌলতপুর, কোতোয়ালি, কুমিল্লার দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পুলিশ বলছে, তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। তাই ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা বা হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

Leave a Reply