
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, দালালচক্র নির্মূল ও অবকাঠামোগত সংকট সমাধানে আশ্বাস
লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি :
কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) সংসদীয় আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম শনিবার (২ মে) আকস্মিকভাবে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেছেন। তাঁর এই আকস্মিক সফরকে ঘিরে হাসপাতালজুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক আলোচনা ও উৎসাহের পরিবেশ।
পরিদর্শনকালে তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ, ভর্তি রোগীদের কক্ষ, জরুরি বিভাগ এবং চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি হাসপাতালের অবকাঠামোগত অবস্থা, রোগীদের সেবার মান এবং চিকিৎসক-কর্মচারীদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
সকালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলম ফুলেল শুভেচ্ছার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সদস্যকে বরণ করে নেন। পরে হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম, সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং প্রদান করেন তিনি।
পরিদর্শনের সময় এমপি মো. আবুল কালাম ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির বিষয়গুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি রোগীদের চিকিৎসা গ্রহণে কোনো ধরনের হয়রানি বা অবহেলা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও খোঁজ নেন। অনেক রোগী ও স্বজন হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা, ওষুধ সংকট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয় তুলে ধরেন।
এ সময় জাতীয় সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম বলেন,
“জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কোনো রোগী যেন প্রকৃত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“হাসপাতালে কোনো ধরনের দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বরদাশত করা হবে না। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে চিকিৎসাসেবা পায়, সেজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার নামে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলম হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এতে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীরা আতঙ্কের মধ্যেই প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তিনি আরও বলেন,
“হাসপাতালের আবাসন সংকট অত্যন্ত প্রকট। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নির্মিত সরকারি বাসভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে অনেক চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অতিরিক্ত খরচে বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। এতে কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।”
ডা. নাজিয়া বিনতে আলম হাসপাতালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সংকট, জনবল ঘাটতি এবং রোগীর তুলনায় সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার বিষয়ও জাতীয় সংসদ সদস্যের কাছে তুলে ধরেন। তিনি হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
পরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলমের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. মোস্তফা হলরুমে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম।
মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন,
“উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনবল সংকট নিরসন ও আবাসন সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। আশা করছি আগামী অর্থবছরে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সেবা দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। একজন রোগী যখন হাসপাতালে আসে, তখন সে শুধু চিকিৎসা নয়—আন্তরিক আচরণ ও মানবিক সহায়তাও প্রত্যাশা করে।”
সভায় উপস্থিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিভিন্ন সমস্যা ও বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তারা হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা, লাকসাম পৌরসভা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র আলহাজ মজির আহমদ, সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম মানু, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বাদল, পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ হোসেন মুশু, পৌরসভা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. কামরুল হাসানসহ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, জাতীয় সংসদ সদস্যের এই আকস্মিক পরিদর্শনের ফলে হাসপাতালের দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, আবাসন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে উপজেলার সাধারণ মানুষ আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।

