

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
সময় বদলেছে, বিলুপ্ত হয়েছে জমিদারি প্রথা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে জমিদারদের সেই প্রতাপপ্রতিপত্তি। তবে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় এখনো দাঁড়িয়ে আছে জমিদারি আমলের স্মৃতিবিজড়িত অসংখ্য স্থাপনা। কোথাও ভগ্নপ্রায় দেয়াল, কোথাও পুরোনো ফটক, দিঘি, মন্দির-মসজিদ, কাছারিঘর কিংবা শতবর্ষী আসবাবপত্র সবকিছুই যেন অতীতের গল্প বলে।
এসব জমিদারবাড়ি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এগুলো কুমিল্লার সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক স্থাপনাই আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
জাহাপুর জমিদারবাড়ি, মুরাদনগর
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার জাহাপুর জমিদারবাড়ি জেলার অন্যতম আলোচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে জাহাপুরে এ পরিবারের বসতির ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জমিদারি প্রতিষ্ঠার সময় হিসেবে ১৮৬২ সালের কথাও পাওয়া যায়।
জমিদারবাড়ির প্রবেশপথে রয়েছে সিংহের মূর্তি। পাশাপাশি রয়েছে পুরোনো হাতিশালা ও আস্তাবল। জমিদারদের ব্যবহৃত নকশা করা আসবাবপত্র, পুরোনো পানির ফিল্টার, রুপার ছাতাসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনো সংরক্ষিত রয়েছে।
জমিদার অশ্বিনী কুমার রায়ের প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ দেবের মন্দির ও রথও এ বাড়ির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরোনো স্থাপত্য ও নানা নিদর্শনের কারণে বাড়িটি ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
বাঙ্গরা রূপবাবুর জমিদারবাড়ি
মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা পূর্ব ইউনিয়নে রয়েছে রূপবাবুদের ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ২৫০ বছর আগে এ অঞ্চলের নয়টি গ্রামজুড়ে রূপবাবুদের জমিদারি বিস্তৃত ছিল।
কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এই জমিদারবাড়িটির অনেক অংশ বর্তমানে জরাজীর্ণ। অবহেলা ও দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
রহিমপুরের পোদ্দার জমিদারবাড়ি
মুরাদনগরের জমিদারি ঐতিহ্যের আলোচনায় রহিমপুরের পোদ্দার জমিদারবাড়ির নামও উল্লেখযোগ্য। জাহাপুর, বাঙ্গরা রূপবাবুদের বাড়ির পাশাপাশি রহিমপুরের পোদ্দার বাড়িও এ অঞ্চলের জমিদারি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনাটিও হারাচ্ছে তার পুরোনো জৌলুস। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদারবাড়ি, পশ্চিমগাঁও লাকসাম।
কুমিল্লার জমিদারি ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৮৩৪ সালে পশ্চিমগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৪ সালে পশ্চিমগাঁওয়ে তাঁর জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর দোতলা প্রাসাদটির সঙ্গে রয়েছে প্রবেশদ্বার, বৈঠকখানা, পুকুর, মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহ।
নবাব ফয়জুন্নেছার শিক্ষা, সমাজসেবা ও নারী জাগরণে অবদানের কারণেও পশ্চিমগাঁওয়ের এ জমিদারবাড়ি কুমিল্লার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সংরক্ষণ জরুরি
জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু দশক আগে। কিন্তু জমিদারবাড়িগুলো আজও বহন করছে একটি সময়ের ইতিহাস। এসব স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৎকালীন মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর নানা স্মৃতি।
স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের মতে, কুমিল্লার জমিদারবাড়িগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণ, স্থাপত্য জরিপ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন ভবনগুলোকে সংরক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে জাহাপুর জমিদারবাড়ির মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যেসব ভবন এখনো টিকে আছে, সেগুলো দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারিয়ে যেতে পারে।
কুমিল্লার জমিদারবাড়িগুলো তাই শুধু অতীতের গল্প নয়—এগুলো আমাদের মাটির ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। সময় থাকতে এসব স্থাপনা সংরক্ষণ করা না গেলে আগামী প্রজন্ম হয়তো ইতিহাসের বইয়ে তাদের নাম পড়বে, কিন্তু চোখের সামনে সেই ইতিহাসের নিদর্শন দেখার সুযোগ নাও পেতে পারে।
