

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাহিত্য কখনো কেবল শব্দের বিন্যাস নয়; এটি একজন মানুষের জীবন, সংগ্রাম, অনুভূতি এবং সমাজকে দেখার এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। সেই আলোয় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন লেখক ও কথাসাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল। চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে তিনি আজ দুই বাংলার সাহিত্যজগতে পরিচিত এক নাম। তাঁর লেখনী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে।
শাম্মী তুলতুলের বেড়ে ওঠা একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে। পারিবারিক ঐতিহ্যই তাঁর সৃজনশীলতার প্রথম পাঠশালা। তাঁর দাদা আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা, লেখক এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। অন্যদিকে নানী কাজী লতিফা হক বেগম ছিলেন সুপরিচিত লেখক। তাই শৈশব থেকেই বই, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে গড়ে ওঠে তাঁর মনন।

ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর লেখার প্রতি গভীর অনুরাগ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুরাগ পরিণত হয়েছে একনিষ্ঠ সাহিত্যসাধনায়। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে। পাশাপাশি ভারত, ফ্রান্স, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির বাংলা ভাষার বিভিন্ন পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্ম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর এই ধারাবাহিক উপস্থিতি বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছে।
শৈশবে তিনি ছিলেন প্রাণচঞ্চল। নাচ, গান, আবৃত্তি ও খেলাধুলা—সব ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সমান আগ্রহ। তবে শেষ পর্যন্ত কলমই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। বর্তমানে তিনি লেখক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, নজরুল-গবেষণায় আগ্রহী সাহিত্যকর্মী, রেডিও অনুষ্ঠান পরিচালক, খবর পাঠিকা, ভয়েস প্রেজেন্টার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট এবং মডেল হিসেবে কাজ করে চলেছেন।

বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। ২০২২ সালের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘নরকে আলিঙ্গন’ পাঠকমহলে আলোচনার জন্ম দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘চোরাবালির বাসিন্দা’, ‘পদ্মবু’, ‘মনজুয়াড়ি’ এবং ‘একজন কুদ্দুস ও কবি নজরুল’। মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক বাস্তবতা এবং ইতিবাচক বার্তা তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শিশু-কিশোর সাহিত্যেও রয়েছে তাঁর সমান বিচরণ। তাঁর লেখা ‘পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ’ গল্পটি দীপ্ত টিভিতে নাট্যরূপে প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর রচনায় নির্মিত ‘লাল শরবত’ নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে সিটি এফএমে। তাঁর একটি গল্প বর্তমানে ভারতে গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বর্তমানে তাঁর বই রকমারি, প্রথমা, দারাজসহ বিভিন্ন অনলাইন বুকস্টোরে পাওয়া যায়। পাশাপাশি রবি বইঘর এবং মোবাইলভিত্তিক ই-বুক প্ল্যাটফর্মেও পাঠকেরা তাঁর বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সাহিত্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড, সাউথ এশিয়া গোল্ডেন পিস অ্যাওয়ার্ড, নজরুল অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার, সোনার বাংলা সাহিত্য সম্মাননা, রোটারি সম্মাননা, উইমেন পাওয়ার লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড–২০২৫, ময়ূরপঙ্খী স্টার অ্যাওয়ার্ড–২০২৫, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সম্মাননা এবং রবীন্দ্র রত্ন পুরস্কার–২০২৬। খাগড়াছড়ির পাঠকসমাজ ভালোবেসে তাঁকে ‘রাজকন্যা’ উপাধিতেও সম্মানিত করেছে।
গণমাধ্যমেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। রেডিওতে খবর পাঠ, অনুষ্ঠান পরিচালনা, টেলিভিশনে আবৃত্তি পরিবেশন এবং সম্প্রতি বেগম রোকেয়ার চরিত্রে একটি ম্যাগাজিনের কভার মডেল হিসেবে উপস্থিত হওয়া—সব মিলিয়ে তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনশীল পরিচয় আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
জীবনের পথচলা তাঁর জন্য সবসময় সহজ ছিল না। সামাজিক ও পারিবারিক নানা বাধা পেরিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। কিন্তু প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাকে তিনি রূপ দিয়েছেন নতুন প্রেরণায়। তাঁর বিশ্বাস, একজন লেখকের দায়িত্ব শুধু গল্প বলা নয়; সমাজকে ভাবতে শেখানো, মানুষকে অনুপ্রাণিত করা এবং মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে শাম্মী তুলতুল বলেন, “লেখালেখি আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। আমি চাই আমার প্রতিটি লেখা পাঠকের মনে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক। সাহিত্য মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে নতুন আলোর পথ দেখাতে পারে—এই বিশ্বাসই আমাকে প্রতিনিয়ত লিখতে অনুপ্রাণিত করে।”
সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর পরিচয়ের পরিধি, কিন্তু বদলায়নি তাঁর কলমের প্রতি ভালোবাসা। নতুন নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন আরও বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের দিকে। তাঁর এই নিরন্তর যাত্রা প্রমাণ করে—সত্যিকারের সৃজনশীলতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই; প্রতিভা ও অধ্যবসায়ই একজন লেখককে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
