মনোহরগঞ্জে সড়ক নির্মাণে ধীরগতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ।

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মৈশাতুয়া ইউনিয়নের ইসলামপুর থেকে খালপাড় হয়ে গজরাপাড়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণকাজে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পর সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত গতিতে কাজ এগোচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে নিম্নমানের খোয়া, মাটি ও বালির মিশ্রণ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে গজরাপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, ইসলামপুর, খালপাড়সহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বর্ষাকালে সড়কের বিভিন্ন অংশে কাদা ও পানি জমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এতে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের প্রতিদিনের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপুর থেকে খালপাড় হয়ে গজরাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬১৫ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ ফুট প্রশস্ত সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কাজ শুরু হলেও বিভিন্ন সময় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন স্থানে রাখা বালু ও খোয়া দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে কাজ শুরু হলেও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ সড়কের পাশে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান-মোস্তফা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছাড়াও কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ সড়কটি ব্যবহার করেন। ফলে সড়কের দুরবস্থার প্রভাব পড়ছে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

গজরাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মুমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির দুরবস্থার কারণে এলাকার মানুষ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে অনেক সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ভালো সড়কের অভাবে এলাকার স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।

ইসলামপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা শুকর আলম বলেন, বর্ষার আগে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বালু ফেলে রাখা হয়েছিল। বৃষ্টির পর এসব স্থানে কাদা তৈরি হওয়ায় মানুষের চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কৃষিপণ্য বাড়িতে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

খালপাড় এলাকার শাহজাহান সিরাজ ও নাজমা বেগম বলেন, সড়কটির বর্তমান অবস্থায় অসুস্থ রোগী নিয়ে যাতায়াত করা কঠিন। রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করতে না চাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান তারা।

স্থানীয় শিক্ষার্থী ইসরাফিল ইসলাম শান্ত জানায়, বৃষ্টি হলেই সড়কের বিভিন্ন অংশে কাদাপানি জমে যায়। এতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় পোশাক ও বই-খাতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে সমস্যায় পড়ে।

গজরাপাড়া উত্তরপাড়ার আমির হোসেন ও আব্দুল বাতেন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে তারা সড়কটির উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাজ শুরু হওয়ায় তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু কাজের ধীরগতিতে সেই প্রত্যাশা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সরেজমিন তদারকিতে দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানান।

স্থানীয় হকার অর্জুন ঘোষ বলেন, এলাকার কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য বাজারে নিতে সড়কটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভালো সড়ক হলে পরিবহন খরচ কমবে এবং সহজে পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হবে। তাই দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান-মোস্তফা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়ায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছিল। কিন্তু কাজ শুরুর পর একপর্যায়ে দীর্ঘ সময় নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। পরে আবার কাজ শুরু হলেও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সড়কটি যেন টেকসই হয়, সে জন্য যথাযথ মান বজায় রেখে কাজ করার দাবি জানান তিনি।

গজরাপাড়া এলাকার আমান উল্লাহ ও আবু আজম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। তাদের দাবি, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার আহ্বান জানান তারা।

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন জানান, ইসলামপুর থেকে খালপাড় হয়ে গজরাপাড়া পর্যন্ত ১ হাজার ৬১৫ মিটার দীর্ঘ ও ১০ ফুট প্রশস্ত সড়কটি পাকা করতে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মদিনা কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বর্ষার কারণে কিছুদিন কাজ করার পর তা বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ধরনের সামগ্রী দিয়ে কাজ করতে দেওয়া হবে না বলে মুঠোফোনে জানান তিনি।

অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উপঠিকাদার জাহাঙ্গীর আলম নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বর্ষার কারণে কাজ শুরু করার পর কিছুদিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বর্তমানে আবার কাজ চলছে এবং এখন সাব-বেইজের কাজ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, সম্ভব হলে আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার দাবি, নির্মাণকাজে মানসম্মত সামগ্রীই ব্যবহার করা হচ্ছে।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকিতে সড়কটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হবে এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হবে। সড়কটি চলাচলের উপযোগী হলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় এলাকার মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

Leave a Reply