

প্রশাসনের অভিযানে জব্দ মাটি–বালু নিলামে বিক্রি, স্বস্তি ফিরেছে এলাকাবাসীর মাঝে
লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ
কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভার পশ্চিমগাঁও এলাকায় অবস্থিত শতবর্ষী “জোড়পুকুর” রাতের আঁধারে ভরাটের ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার পরিবেশ রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই পুকুরটি একটি প্রভাবশালী মহলের দখল ও ভরাটচেষ্টার শিকার হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশাসনের দ্রুত অভিযানের কারণে আপাতত পুকুরটি সম্পূর্ণ ভরাটের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লাকসাম-শ্রীয়াং সড়কের পাশের পশ্চিমগাঁও এলাকায় অবস্থিত প্রায় ১ দশমিক ০৬ একর আয়তনের এই পুকুরটি এলাকাজুড়ে “জোড়পুকুর” নামে পরিচিত। একই এলাকায় পাশাপাশি আরেকটি পুকুর থাকায় বহু বছর আগে থেকেই এই নামের প্রচলন হয়। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, পুকুরটি শুধু একটি জলাধার নয়; বরং এটি এলাকার পরিবেশ ও ঐতিহ্যের অংশ। বাপ-দাদার আমল থেকে মানুষ এই পুকুরের পানি ব্যবহার করে আসছেন। গ্রীষ্মকালে পানি সংকট মোকাবিলা এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে পুকুরটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েক দিন ধরে গভীর রাতে ট্রাক ও ট্রাক্টর দিয়ে বালু ও মাটি এনে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছিল। দিনের বেলায় কাজ বন্ধ থাকলেও রাত নামলেই একের পর এক ট্রাক এসে পুকুরে মাটি ফেলত। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে। অনেকেই প্রথমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি, কারণ ভরাটের পেছনে একটি প্রভাবশালী চক্র জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পুকুরটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশ ভরাট হয়ে যায়। একসময় যেখানে বিশাল জলরাশি দেখা যেত, সেখানে এখন শুকনো মাটির স্তূপ দেখা যাচ্ছিল। স্থানীয়দের আশঙ্কা ছিল, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই পুরো পুকুরটি বিলীন হয়ে যাবে।
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠলে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে রোববার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নার্গিস সুলতানার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে পুকুর ভরাটের সত্যতা পাওয়া যায়। যদিও অভিযানের সময় ভরাটকাজে জড়িত কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি, তবে বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি জব্দ করা হয়।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ বর্গফুট বালু-মাটি জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে ওই বালু ও মাটি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে সরকারি সম্পদ হিসেবে তা সংরক্ষণ করা যায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া সম্ভব হয়।
সোমবার দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশ্য নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে চারজন অংশগ্রহণ করেন। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মিজানুর রহমান ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকায় জব্দ করা বালু-মাটি কিনে নেন। নিলাম কার্যক্রমে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিলন চাকমা, উপজেলা প্রকৌশলী সাদিকুল জাহান (রিদান), উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আহমেদ উল্লাহ (সবুজ) এবং লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী কামরুন্নাহার লাইলী উপস্থিত ছিলেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা শামছুল আলম বলেন,
“বাপ-দাদার আমল থেকে এই পুকুর দেখে আসছি। এই পুকুর আমাদের এলাকার প্রাণ ছিল। পানি ব্যবহার থেকে শুরু করে পরিবেশ রক্ষা—সবকিছুতেই এর ভূমিকা ছিল অনেক। কিছু প্রভাবশালী লোক আমাদের চোখের সামনে এটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। প্রশাসনের এই উদ্যোগে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।”
আরেক স্থানীয় যুবক মানিক মিয়া বলেন,
“চার-পাঁচ দিন ধরে রাত হলেই ট্রাক আর ট্রাক্টরের শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারত না। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পুকুর ভরাট করা হচ্ছিল। আমরা চাই পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরে আসুক। এই পুকুরে আমাদের শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু এই পুকুর নয়, লাকসামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীদের দখল ও ভরাটের কারণে একের পর এক জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। তাঁরা জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পুকুরটি পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিলন চাকমা জানান, নিলামে বিক্রি হওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। পরবর্তীতে ওয়ার্ক অর্ডারের মাধ্যমে পুকুর থেকে মাটি ও বালু অপসারণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যাতে কেউ আবার পুকুরটি ভরাটের চেষ্টা করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের চলমান উদ্যোগের মাধ্যমে শতবর্ষী জোড়পুকুরটি আবারও তার আগের রূপ ফিরে পাবে এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
