এক যুগ ধরে হামলা-চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ: নিরাপত্তাহীনতায় সাংবাদিক মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি।

কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লা নগরীর পেশাজীবী ও সাংবাদিক মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রর ওপর দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে ধারাবাহিক হামলা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র—এমন অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক। একাধিক মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও স্মারকলিপি দেওয়ার পরও তিনি ও তাঁর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র জানান, সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর ২০২৫ সালে তিনি তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১ এ একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩০৭, ৩৮৫, ৪২০, ৫০০, ৫১১, ৩৭৯ এবং ৫০৬(২)/৩৪ ধারায় রুজুকৃত মামলার নম্বর ৬১৫/২৫।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালের ৩ মে থেকে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক সাধারণ ডায়েরি করতে হয়েছে। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা, প্রকাশ্যে মারধর, চাঁদা দাবি এবং মোটরসাইকেলে আসা হেলমেটধারী দুর্বৃত্তদের হাতে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়ের করা মামলার দুজন আসামি গ্রেপ্তার হলেও অপর সহযোগীরা এখনও মামলা প্রত্যাহারের জন্য নানাভাবে ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া তাঁর অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুটি মামলা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্যরা মুখে মাস্ক ও মাথায় লাল-কালো হেলমেট পরে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে চলাচল করে। চক্রটি ভাড়াটে সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী এবং কিছু নারী সদস্যকে ব্যবহার করে হামলা, ব্ল্যাকমেইল, ছিনতাই, সাইবার হয়রানি এবং ভুয়া প্রশাসনিক পরিচয়ে অপহরণ ও জিম্মির মতো অপরাধ সংঘটিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এই চক্রের কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজ ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে সাংবাদিক মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রর বিকৃত ও আপত্তিকর ছবি, এমনকি কাফনে মোড়ানো প্রতীকী ছবি ছড়িয়ে দিয়ে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ১৩ মার্চ ২০২৬ কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অনলাইন জিডি (নং-৯৫৩) করেন তিনি। এছাড়া ১০ মে ২০২৬ জেলা প্রশাসকের কাছে এবং ২৬ মে ২০২৬ পুলিশ সুপারের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।

পাশাপাশি বিষয়টি অবগতির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, আইজিপি, র‍্যাব সদর দপ্তর, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি এবং কুমিল্লা প্রেস ক্লাবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

মানবাধিকার কর্মী ও “মানবাধিকার খবর”-এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন,
“একজন গণমাধ্যমকর্মী আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও যদি বছরের পর বছর নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”

এ বিষয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলা ও জিডির ভিত্তিতে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তারা ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তারে কিছুটা সময় লাগছে, তবে দ্রুতই বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আইনের শাসনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Leave a Reply