লালমাইয়ে ধানক্ষেতের পাশে স্কুলছাত্রীর মরদেহ, বাবাকে পাঠানো হয়েছিল লাইভ লোকেশন

কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেতের পাশ থেকে জান্নাতুল তাজমীন (১৩) নামের এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। মরদেহের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, কিশোরীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে কে বা কারা এবং কী কারণে তাকে হত্যা করেছে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ফসলি জমি থেকে জান্নাতুল তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিহত জান্নাতুল তাজমীন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবার নাম আব্দুল আলিম। বাবার চাকরির কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগে তাজমীন বাসা থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল। এরপর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে তৈরি হয় রহস্য। পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে গভীর রাতে বাবার মোবাইলে একটি বার্তা পাঠায় তাজমীন। বার্তার সঙ্গে সে তার লাইভ লোকেশনও পাঠিয়েছিল এমন তথ্য সামনে এসেছে। কিন্তু সে সময় বাবা ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ওই বার্তা দেখতে পারেননি।

সকালে বার্তাটি দেখার পর লোকেশন অনুযায়ী খোঁজ করতে গিয়ে ফসলি জমিতে মেয়ের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন বাবা—এমন দাবি পরিবারের।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তাজমীনের সর্বশেষ অবস্থান কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় আসার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গেছে। পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে সে নেমেছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকায় কীভাবে পৌঁছাল, কার সঙ্গে ছিল এবং সেখানে কী ঘটেছিল—এসব বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখা যায়। আশপাশের ধানক্ষেতেও কিছু আলামত পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, ধানক্ষেতের ভেতরে ধস্তাধস্তি বা দৌড়াদৌড়ির ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এসব আলামতের প্রকৃত তাৎপর্য ফরেনসিক ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে হত্যার ধারণা করা হলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বাসা থেকে বের হওয়ার পর দীর্ঘ সময় তাজমীন কোথায় ছিল?

সে কি কারও সঙ্গে ছিল? তাকে কেউ কোথাও নিয়ে গিয়েছিল কি না? কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় কীভাবে এল? পদুয়ার বাজার থেকে লালমাইয়ের জগতপুরে কীভাবে পৌঁছাল? যে সিএনজিটি ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে, সেটির সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— গভীর রাতে বাবাকে কেন ‘এসে আমাকে নিয়ে যাও’ ধরনের বার্তা পাঠিয়েছিল এবং সঙ্গে লাইভ লোকেশনই বা কেন পাঠিয়েছিল

বার্তাটি পাঠানোর সময় তাজমীন কি কোনো বিপদের মধ্যে ছিল? সে কি কারও কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করছিল? নাকি অন্য কোনো কারণে সে বাবার কাছে সাহায্য চেয়েছিল—এর উত্তর এখনো মেলেনি।

পরিবারের পক্ষ থেকেও এখন প্রশ্ন উঠছে, বাসা থেকে বের হওয়ার পর এতদিন সে কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল এবং তার সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিল—এসব বিষয় দ্রুত তদন্ত করে বের করার দাবি উঠেছে।

তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে তাজমীনের মৃত্যুর সম্পর্ক নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ বলছে, মোবাইল ফোনের তথ্য, লাইভ লোকেশনের রেকর্ড, সিএনজির মালিক ও চালকের পরিচয়, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণ করলেই ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে।

একটি কিশোরীর মৃত্যু ঘিরে এখন অপেক্ষা শুধু সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার—সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল? কে বা কারা ছিল তার সঙ্গে? আর মৃত্যুর আগে বাবাকে পাঠানো সেই শেষ বার্তার পেছনে কী ছিল

Leave a Reply